ইসলামের প্রথম মসজিদ — এখানে দুই রাকাত নামাজে এক উমরাহর সওয়াব।
- কোথায়
- মসজিদে নববী থেকে প্রায় ৩.৫ কিমি দক্ষিণে
- কবে
- হিজরতের সময়, ১ হিজরি — ইসলামের প্রথম মসজিদ
- ফজিলত
- ঘরে অজু করে এসে দুই রাকাত = এক উমরাহর সওয়াব
- নবী ﷺ-এর অভ্যাস
- প্রতি শনিবার আসতেন
১ হিজরতের পথে প্রথম মসজিদ
সাওর গুহা থেকে বেরিয়ে দীর্ঘ মরুপথ পাড়ি দিয়ে নবী ﷺ ও আবু বকর (রা.) মদিনার উপকণ্ঠ কুবায় পৌঁছালেন। মদিনার মানুষ কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে অপেক্ষা করত, দুপুরের রোদ চড়লে ফিরে যেত। সেদিন এক ইহুদি দুর্গের ওপর থেকে তাঁদের দেখে চিৎকার করল: হে আরবরা, তোমরা যাঁর অপেক্ষায় ছিলে তিনি এসেছেন!
কুবায় বনু আমর ইবনে আওফ গোত্রে তিনি চৌদ্দ দিন ছিলেন (সহিহ বুখারি ৩৯৩২)। এ সময়ই নিজ হাতে প্রথম মসজিদের ভিত্তি রাখলেন — ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মসজিদ। আলী (রা.)-ও মক্কায় আমানত ফিরিয়ে দিয়ে এখানে এসে যোগ দেন।
২ কুরআনের সাক্ষ্য
কুরআন এ মসজিদ সম্পর্কে বলেছে: “যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ওপর রাখা হয়েছে, সেটিই আপনার দাঁড়ানোর বেশি উপযুক্ত; সেখানে এমন লোক আছে যারা পবিত্র থাকতে ভালোবাসে” (সূরা তাওবা ১০৮)। কুবাবাসী অজু-ইস্তিঞ্জায় পানি ব্যবহারে খুব যত্নশীল ছিলেন — সেই প্রশংসাই আয়াতে।
৩ নামাজের মাঝে কিবলা পরিবর্তন
কিবলা পরিবর্তনের পরদিন কুবার মুসল্লিরা ফজরের নামাজ বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে পড়ছিলেন। একজন এসে বললেন: রাতে নবী ﷺ-এর ওপর কুরআন নাজিল হয়েছে, কাবার দিকে মুখ করার আদেশ এসেছে। তাঁরা নামাজের মধ্যেই ঘুরে কাবার দিকে ফিরে গেলেন (সহিহ বুখারি ৪০৩)।
📖 কুরআনে এই জায়গা
لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَىٰ مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ ۚ فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا ۚ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ
যে মসজিদের ভিত্তি রাখা হয়েছে তাকওয়ার উপর প্রথম দিন থেকে, সেটিই তোমার দাঁড়াবার যোগ্য স্থান। সেখানে রয়েছে এমন লোক, যারা পবিত্রতাকে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালবাসেন।
— সূরা আত-তাওবা, আয়াত ১০৮ (অংশ)
📜 পূর্ণ হাদিস
হাদিসগুলো সম্পূর্ণ দেওয়া হয়েছে — কোনো অংশ বাদ দেওয়া হয়নি। প্রতিটির নিচে আরবি মূল পাঠও আছে।
হাদিস ১ · সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৪১২
এক উমরাহর সওয়াব
মূল কথা: ঘরে পবিত্র হয়ে কুবায় এসে নামাজ পড়লে একটি উমরাহর সমান সওয়াব।
সাহল ইবনু হুনাইফ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি নিজের ঘরে পবিত্রতা অর্জন করলো, অতঃপর কুবা মসজিদে এসে এক ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) পড়লো, তার জন্য একটি উমরাহর সমান সাওয়াব রয়েছে।
আরবি মূল পাঠ দেখুন ▼আরবি মূল পাঠ লুকান ▲
حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عَمَّارٍ، حَدَّثَنَا حَاتِمُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ، وَعِيسَى بْنُ يُونُسَ، قَالاَ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سُلَيْمَانَ الْكِرْمَانِيُّ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا أُمَامَةَ بْنَ سَهْلِ بْنِ حُنَيْفٍ، يَقُولُ قَالَ سَهْلُ بْنُ حُنَيْفٍ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ " مَنْ تَطَهَّرَ فِي بَيْتِهِ، ثُمَّ أَتَى مَسْجِدَ قُبَاءٍ، فَصَلَّى فِيهِ صَلاَةً، كَانَ لَهُ كَأَجْرِ عُمْرَةٍ " .
— সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৪১২
হাদিস ২ · সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৯৩
প্রতি শনিবার কুবায়
মূল কথা: নবী ﷺ প্রতি শনিবার কখনো হেঁটে, কখনো বাহনে কুবায় আসতেন।
ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি শনিবার কুবা মসজিদে আসতেন, কখনো পদব্রজে, কখনো সওয়ারীতে। ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাযি.)-ও ঐরূপ করতেন।
আরবি মূল পাঠ দেখুন ▼আরবি মূল পাঠ লুকান ▲
حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ مُسْلِمٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَأْتِي مَسْجِدَ قُبَاءٍ كُلَّ سَبْتٍ مَاشِيًا وَرَاكِبًا. وَكَانَ عَبْدُ اللَّهِ ـ رضى الله عنهما ـ يَفْعَلُهُ.
— সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৯৩
হাদিস ৩ · সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৯৩২
কুবায় চৌদ্দ দিন, তারপর মদিনায়
মূল কথা: আনাস (রা.)-এর বর্ণনায় আগমন, বনু নাজ্জারের অভ্যর্থনা, মসজিদে নববী নির্মাণ।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আসলেন তখন মদিনার উঁচু এলাকার ‘আমর ইবনু ‘আউফ গোত্রে অবস্থান করলেন। আনাস (রাঃ) বলেন, সেখানে তিনি চৌদ্দ দিন থাকলেন। এরপর তিনি বানু নাজ্জারের নেতৃস্থানীয় লোকেদের কাছে খবর পাঠালেন। তারা সকলেই তরবারি ঝুলিয়ে হাযির হলেন। আনাস (রাঃ) বলেন, সেই দৃশ্য এখনো যেন আমি দেখতে পাচ্ছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সওয়ারীর উপর এবং আবূ বাকর (রাঃ) তাঁর পিছনে উপবিষ্ট রয়েছেন, আর বনু নাজ্জারের নেতাগণ রয়েছেন তাদের পার্শ্বে। অবশেষে আবূ আইউব (রাঃ)-এর বাড়ির চত্বরে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মালপত্র নামালেন। রাবী বলেন, ঐ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানেই সালাতের সময় হত সেখানেই সালাত আদায় করে নিতেন। এবং তিনি কোন কোন সময় ছাগল-ভেড়ার খোঁয়াড়েও সালাত আদায় করতেন। রাবী বলেন, তারপর তিনি মাসজিদ তৈরির নির্দেশ দিলেন। তিনি বনী নাজ্জারের নেতাদের ডাকলেন এবং তারা এলে তিনি বললেন, তোমাদের এ বাগানটি আমার নিকট বিক্রি কর। তারা বলল, আল্লাহর শপথ, আমরা বিক্রি করব না। আল্লাহ শপথ-এর বিনিময় আল্লাহর নিকটই চাই। রাবী বলেন, এখানে কি ছিল, আমি তোমাদের বলছি স্থানে তখন ছিল মুশরিকদের পুরাতন কবর, বাড়ী ঘরের কিছু ভগ্নাবশেষ কয়েকটি খেজুরের গাছ। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে মুশরিকদের কবরগুলি মিশিয়ে দেয়া হল। ভগ্ন চিহ্ন সমতল করা হল, খেজুর গাছগুলি কেটে ফেলা হল। রাবী বলে, কাটা খেজুর গাছের কান্ডগুলি মসজিদের কেবলার দিকে এর খুঁটি হিসেবে এক লাইনে স্থাপন করা হল এবং খুঁটির ফাঁকা স্থানে রাখা হল পাথর। তখন সহাবাগণ পাথর বয়ে আনছিলেন এবং ছন্দ যুক্ত কবিতা আবৃত্তি করছিলেনঃ আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাদের সঙ্গে ছিলেন এবং বলেছিলেন, হে আল্লাহ্! আসল কল্যাণ কেবলমাত্র আখিরাতের কল্যাণ। হে আল্লাহ্! তুমি মুহাজির ও আনসারদের সাহায্য কর।
আরবি মূল পাঠ দেখুন ▼আরবি মূল পাঠ লুকান ▲
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ،. وَحَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ مَنْصُورٍ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ الصَّمَدِ، قَالَ سَمِعْتُ أَبِي يُحَدِّثُ، حَدَّثَنَا أَبُو التَّيَّاحِ، يَزِيدُ بْنُ حُمَيْدٍ الضُّبَعِيُّ قَالَ حَدَّثَنِي أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ لَمَّا قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْمَدِينَةَ، نَزَلَ فِي عُلْوِ الْمَدِينَةِ فِي حَىٍّ يُقَالُ لَهُمْ بَنُو عَمْرِو بْنِ عَوْفٍ ـ قَالَ ـ فَأَقَامَ فِيهِمْ أَرْبَعَ عَشْرَةَ لَيْلَةً، ثُمَّ أَرْسَلَ إِلَى مَلإِ بَنِي النَّجَّارِ ـ قَالَ ـ فَجَاءُوا مُتَقَلِّدِي سُيُوفِهِمْ، قَالَ وَكَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى رَاحِلَتِهِ، وَأَبُو بَكْرٍ رِدْفَهُ، وَمَلأُ بَنِي النَّجَّارِ حَوْلَهُ حَتَّى أَلْقَى بِفِنَاءِ أَبِي أَيُّوبَ، قَالَ فَكَانَ يُصَلِّي حَيْثُ أَدْرَكَتْهُ الصَّلاَةُ، وَيُصَلِّي فِي مَرَابِضِ الْغَنَمِ، قَالَ ثُمَّ إِنَّهُ أَمَرَ بِبِنَاءِ الْمَسْجِدِ، فَأَرْسَلَ إِلَى مَلإِ بَنِي النَّجَّارِ، فَجَاءُوا فَقَالَ " يَا بَنِي النَّجَّارِ، ثَامِنُونِي حَائِطَكُمْ هَذَا ". فَقَالُوا لاَ، وَاللَّهِ لاَ نَطْلُبُ ثَمَنَهُ إِلاَّ إِلَى اللَّهِ. قَالَ فَكَانَ فِيهِ مَا أَقُولُ لَكُمْ كَانَتْ فِيهِ قُبُورُ الْمُشْرِكِينَ، وَكَانَتْ فِيهِ خِرَبٌ، وَكَانَ فِيهِ نَخْلٌ، فَأَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِقُبُورِ الْمُشْرِكِينَ فَنُبِشَتْ، وَبِالْخِرَبِ فَسُوِّيَتْ، وَبِالنَّخْلِ فَقُطِعَ، قَالَ فَصَفُّوا النَّخْلَ قِبْلَةَ الْمَسْجِدِ ـ قَالَ ـ وَجَعَلُوا عِضَادَتَيْهِ حِجَارَةً. قَالَ قَالَ جَعَلُوا يَنْقُلُونَ ذَاكَ الصَّخْرَ وَهُمْ يَرْتَجِزُونَ، وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَعَهُمْ يَقُولُونَ اللَّهُمَّ إِنَّهُ لاَ خَيْرَ إِلاَّ خَيْرُ الآخِرَهْ فَانْصُرِ الأَنْصَارَ وَالْمُهَاجِرَهْ.
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৯৩২
হাদিস ৪ · সহিহ বুখারি, হাদিস ৪০৩
নামাজের মধ্যে কিবলা ঘোরানো
মূল কথা: কুবার মুসল্লিরা ফজরের নামাজে খবর পেয়ে কাবার দিকে ঘুরে গেলেন।
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা লোকেরা কুবা নামক স্থানে ফজরের সালাত আদায় করছিলেন। এমন সময় তাদের নিকট এক ব্যক্তি এসে বললেন যে, এ রাতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে। আর তাঁকে কা‘বামুখী হবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কাজেই তোমারা কা‘বার দিকে মুখ কর। তখন তাঁদের চেহারা ছিল শামের (বায়তুল মুকাদ্দাসের) দিকে। একথা শুনে তাঁরা কা‘বার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
আরবি মূল পাঠ দেখুন ▼আরবি মূল পাঠ লুকান ▲
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكُ بْنُ أَنَسٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، قَالَ بَيْنَا النَّاسُ بِقُبَاءٍ فِي صَلاَةِ الصُّبْحِ إِذْ جَاءَهُمْ آتٍ فَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَدْ أُنْزِلَ عَلَيْهِ اللَّيْلَةَ قُرْآنٌ، وَقَدْ أُمِرَ أَنْ يَسْتَقْبِلَ الْكَعْبَةَ فَاسْتَقْبِلُوهَا، وَكَانَتْ وُجُوهُهُمْ إِلَى الشَّأْمِ، فَاسْتَدَارُوا إِلَى الْكَعْبَةِ.
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৪০৩
✅ জিয়ারতের আদব ও টিপস
- •হোটেল থেকে অজু করে বের হোন — হাদিসে ঘরে পবিত্র হয়ে আসার কথা বলা হয়েছে।
- •মসজিদে পৌঁছে দুই রাকাত নফল পড়ুন (নিষিদ্ধ সময় বাদে)।
- •শনিবার সকালে যাওয়া সুন্নাহর অনুসরণ; মসজিদে নববী থেকে হেঁটে যাওয়ার পথও (কুবা ওয়াক) আছে।
হাদিসের বাংলা অনুবাদ প্রচলিত বাংলা অনুবাদ থেকে নেওয়া, আরবি মূল পাঠসহ; হাদিস নম্বর আন্তর্জাতিক প্রচলিত নম্বর অনুযায়ী। ঐতিহাসিক বিবরণ সহিহ হাদিস ও সীরাত গ্রন্থ অনুসারে — যেখানে বর্ণনা দুর্বল বা মতভেদপূর্ণ, সেখানে তা উল্লেখ করা হয়েছে।