নবী ﷺ-এর নিজ হাতে গড়া মসজিদ — এক নামাজ হাজার নামাজের চেয়ে উত্তম।
- নির্মাণ
- ১ হিজরি (৬২২ খ্রি.), নবী ﷺ নিজ হাতে কাজ করেছেন
- প্রথম মসজিদ
- খেজুর গাছের খুঁটি, পাতার ছাদ, কাঁচা ইটের দেয়াল
- এখন
- প্রায় ১০ লাখ মুসল্লির জায়গা
- নামাজের সওয়াব
- অন্য মসজিদের চেয়ে এক হাজার গুণ উত্তম
১ উটনী যেখানে বসল
কুবায় কিছুদিন থাকার পর নবী ﷺ মদিনার মূল অংশে এলেন। প্রত্যেক আনসার পরিবার লাগাম টেনে বলছিল — আমাদের এখানে থাকুন। তিনি বললেন: উটনীকে ছেড়ে দাও, সে আদেশপ্রাপ্ত।
উটনী বনু নাজ্জারের এলাকায় খেজুর শুকানোর একটি খোলা জায়গায় বসে পড়ল। জায়গাটি ছিল দুই এতিম বালক সাহল ও সুহাইলের। তাঁরা বিনামূল্যে দিতে চাইলেও নবী ﷺ দাম দিয়ে কিনে নিলেন। সেখানে ছিল মুশরিকদের কিছু পুরোনো কবর, কিছু ভাঙা ঘর আর খেজুর গাছ — কবর সরিয়ে, জমি সমান করে, গাছ কেটে মসজিদ বানানো হলো (সহিহ বুখারি ৪২৮)।
নবী ﷺ নিজে সাহাবিদের সাথে পাথর আর ইট বইছিলেন, আর সবাই মিলে গাইছিলেন: “হে আল্লাহ, আখিরাতের কল্যাণ ছাড়া আর কোনো কল্যাণ নেই; আনসার আর মুহাজিরদের ক্ষমা করুন।”
২ শুধু মসজিদ নয় — রাষ্ট্রের কেন্দ্র
এই মসজিদ একসাথে ছিল নামাজের জায়গা, মাদরাসা, আদালত, সংসদ আর অতিথিশালা। এক কোণে ছিল “সুফফা” — গৃহহীন গরিব সাহাবিরা সেখানে থেকে ইলম শিখতেন; আবু হুরায়রা (রা.) ছিলেন তাঁদের একজন।
মসজিদের পূর্ব পাশে নবী ﷺ-এর স্ত্রীদের জন্য ছোট ছোট ঘর (হুজরা) বানানো হয়েছিল। আয়েশা (রা.)-এর সেই ঘরেই তিনি ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই শুয়ে আছেন — আজকের সবুজ গম্বুজের নিচে।
পরবর্তী খলিফা ও শাসকেরা বারবার মসজিদ বড় করেছেন — উমর, উসমান (রা.), উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ, উসমানি সুলতানরা, আর সৌদি আমলে বিশাল সম্প্রসারণ। চত্বরের বিশাল স্বয়ংক্রিয় ছাতাগুলো গরমে ছায়া দেয়।
৩ তিন মসজিদের একটি
নবী ﷺ বলেছেন: তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও (বিশেষ সওয়াবের আশায়) সফর করা যাবে না — মসজিদুল হারাম, রাসূলের এই মসজিদ, আর মসজিদুল আকসা (সহিহ বুখারি ১১৮৯)। আর বলেছেন: আমার এই মসজিদে এক নামাজ মসজিদুল হারাম ছাড়া অন্য মসজিদের এক হাজার নামাজের চেয়ে উত্তম (সহিহ বুখারি ১১৯০)।
📜 পূর্ণ হাদিস
হাদিসগুলো সম্পূর্ণ দেওয়া হয়েছে — কোনো অংশ বাদ দেওয়া হয়নি। প্রতিটির নিচে আরবি মূল পাঠও আছে।
হাদিস ১ · সহিহ বুখারি, হাদিস ৪২৮
মসজিদে নববী কীভাবে বানানো হলো
মূল কথা: বনু নাজ্জারের জমি কেনা, কবর সরানো, খেজুর গাছের খুঁটি — আর নবী ﷺ-এর নিজ হাতে কাজ।
আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় পৌঁছে প্রথমে মদিনার উচ্চ এলাকায় অবস্থিত বানূ ‘আমর ইবনু ‘আওফ নামক গোত্রে উপনীত হন। তাদের সঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চৌদ্দ দিন (অপর বর্ণনায় চবিবশ দিন) অবস্থান করেন। অতঃপর তিনি বানূ নাজ্জারকে ডেকে পাঠালেন। তারা কাঁধে তলোয়ার ঝুলিয়ে উপস্থিত হলো। আমি যেন এখনো সে দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন তাঁর বাহনের উপর, আবূ বাকর (রাযি.) সে বাহনেই তাঁর পেছনে আর বানূ নাজ্জারের দল তাঁর আশেপাশে। অবশেষে তিনি আবূ আয়্যূব আনসারী (রাযি.)-র ঘরের সাহানে অবতরণ করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানেই সালাতের ওয়াক্ত হয় সেখানেই সালাত আদায় করতে পছন্দ করতেন এবং তিনি ছাগল-ভেড়ার খোঁয়াড়েও সালাত আদায় করতেন। এখন তিনি মাসজিদ তৈরি করার নির্দেশ দেন। তিনি বানূ নাজ্জারকে ডেকে বললেনঃ হে বানূ নাজ্জার! তোমরা আমার কাছ হতে তোমাদের এই বাগিচার মূল্য নির্ধারণ কর। তারা বললোঃ না, আল্লাহর কসম, আমরা এর দাম নেব না। এর দাম আমরা একমাত্র আল্লাহর নিকটই আশা করি। আনাস (রাযি.) বলেনঃ আমি তোমাদের বলছি, এখানে মুশরিকদের কবর এবং ভগ্নাবশেষ ছিল। আর ছিল খেজুর গাছ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নির্দেশে মুশরিকদের কবর খুঁড়ে ফেলা হলো, অতঃপর ভগ্নাবশেষ সমতল করে দেয়া হলো, খেজুর গাছগুলো কেটে ফেলা হলো অতঃপর মসজিদের কিবলায় সারিবদ্ধ করে রাখা হলো এবং তার দুই পাশে পাথর বসানো হলো। সাহাবীগণ পাথর তুলতে তুলতে ছন্দোবদ্ধ কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -ও তাঁদের সাথে ছিলেন। তিনি তখন বলছিলেনঃ ‘‘হে আল্লাহ! আখিরাতের কল্যাণ ব্যতীত (প্রকৃত) আর কোন কল্যাণ নেই। তুমি আনসার ও মুহাজিরগণকে ক্ষমা কর।’’
আরবি মূল পাঠ দেখুন ▼আরবি মূল পাঠ লুকান ▲
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ، عَنْ أَبِي التَّيَّاحِ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ قَدِمَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْمَدِينَةَ فَنَزَلَ أَعْلَى الْمَدِينَةِ، فِي حَىٍّ يُقَالُ لَهُمْ بَنُو عَمْرِو بْنِ عَوْفٍ. فَأَقَامَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فِيهِمْ أَرْبَعَ عَشْرَةَ لَيْلَةً، ثُمَّ أَرْسَلَ إِلَى بَنِي النَّجَّارِ فَجَاءُوا مُتَقَلِّدِي السُّيُوفِ، كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم عَلَى رَاحِلَتِهِ، وَأَبُو بَكْرٍ رِدْفُهُ، وَمَلأُ بَنِي النَّجَّارِ حَوْلَهُ، حَتَّى أَلْقَى بِفِنَاءِ أَبِي أَيُّوبَ، وَكَانَ يُحِبُّ أَنْ يُصَلِّيَ حَيْثُ أَدْرَكَتْهُ الصَّلاَةُ، وَيُصَلِّي فِي مَرَابِضِ الْغَنَمِ، وَأَنَّهُ أَمَرَ بِبِنَاءِ الْمَسْجِدِ، فَأَرْسَلَ إِلَى مَلإٍ مِنْ بَنِي النَّجَّارِ فَقَالَ " يَا بَنِي النَّجَّارِ ثَامِنُونِي بِحَائِطِكُمْ هَذَا ". قَالُوا لاَ وَاللَّهِ، لاَ نَطْلُبُ ثَمَنَهُ إِلاَّ إِلَى اللَّهِ. فَقَالَ أَنَسٌ فَكَانَ فِيهِ مَا أَقُولُ لَكُمْ، قُبُورُ الْمُشْرِكِينَ، وَفِيهِ خَرِبٌ، وَفِيهِ نَخْلٌ، فَأَمَرَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِقُبُورِ الْمُشْرِكِينَ فَنُبِشَتْ، ثُمَّ بِالْخَرِبِ فَسُوِّيَتْ، وَبِالنَّخْلِ فَقُطِعَ، فَصَفُّوا النَّخْلَ قِبْلَةَ الْمَسْجِدِ، وَجَعَلُوا عِضَادَتَيْهِ الْحِجَارَةَ، وَجَعَلُوا يَنْقُلُونَ الصَّخْرَ، وَهُمْ يَرْتَجِزُونَ، وَالنَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مَعَهُمْ وَهُوَ يَقُولُ " اللَّهُمَّ لاَ خَيْرَ إِلاَّ خَيْرُ الآخِرَهْ فَاغْفِرْ لِلأَنْصَارِ وَالْمُهَاجِرَهْ "
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৪২৮
হাদিস ২ · সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৯০
এক হাজার গুণ সওয়াব
মূল কথা: মসজিদুল হারাম ছাড়া অন্য মসজিদের এক হাজার নামাজের চেয়ে উত্তম।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মাসজিদুল হারাম ব্যতীত আমার এ মসজিদে সালাত আদায় করা অপরাপর মসজিদে এক হাজার সালাতের চেয়ে উত্তম।
আরবি মূল পাঠ দেখুন ▼আরবি মূল পাঠ লুকান ▲
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ زَيْدِ بْنِ رَبَاحٍ، وَعُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي عَبْدِ اللَّهِ الأَغَرِّ، عَنْ أَبِي عَبْدِ اللَّهِ الأَغَرِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " صَلاَةٌ فِي مَسْجِدِي هَذَا خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ صَلاَةٍ فِيمَا سِوَاهُ إِلاَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ ".
— সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৯০
হাদিস ৩ · সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৮৯
যে তিন মসজিদের উদ্দেশে সফর করা যায়
মূল কথা: মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী, মসজিদুল আকসা।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, মাসজিদুল হারাম, মাসজিদুর রাসূল এবং মাসজিদুল আকসা (বায়তুল মাক্দিস) তিনটি মাসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদে (সালাতের) উদ্দেশে হাওদা বাঁধা যাবে না (অর্থাৎ সফর করা যাবে না)।
আরবি মূল পাঠ দেখুন ▼আরবি মূল পাঠ লুকান ▲
حَدَّثَنَا عَلِيٌّ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ سَعِيدٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " لاَ تُشَدُّ الرِّحَالُ إِلاَّ إِلَى ثَلاَثَةِ مَسَاجِدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ، وَمَسْجِدِ الرَّسُولِ صلى الله عليه وسلم وَمَسْجِدِ الأَقْصَى ".
— সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৮৯
✅ জিয়ারতের আদব ও টিপস
- •মদিনায় যাওয়ার নিয়ত হবে মসজিদে নববীর জিয়ারত; সেখানে পৌঁছে রওজায় সালাম দেওয়া সুন্নাহ।
- •ডান পা দিয়ে ঢুকে মসজিদে প্রবেশের দোয়া পড়ুন, দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ুন।
- •প্রতিটি গেটের নম্বর আছে — হোটেলের সবচেয়ে কাছের গেট নম্বরটি মনে রাখুন।
- •নারীদের জন্য আলাদা গেট ও নামাজের জায়গা আছে; রওজা জিয়ারতের সময়ও আলাদা।
হাদিসের বাংলা অনুবাদ প্রচলিত বাংলা অনুবাদ থেকে নেওয়া, আরবি মূল পাঠসহ; হাদিস নম্বর আন্তর্জাতিক প্রচলিত নম্বর অনুযায়ী। ঐতিহাসিক বিবরণ সহিহ হাদিস ও সীরাত গ্রন্থ অনুসারে — যেখানে বর্ণনা দুর্বল বা মতভেদপূর্ণ, সেখানে তা উল্লেখ করা হয়েছে।