দুই কিবলার মসজিদ — কিবলা পরিবর্তনের স্মৃতি।
- কোথায়
- মসজিদে নববী থেকে প্রায় ৫ কিমি উত্তর-পশ্চিমে, বনু সালিমা এলাকা
- নামের অর্থ
- দুই কিবলার মসজিদ
- কবে
- ২ হিজরি, রজব/শাবান মাস
১ ষোলো-সতেরো মাসের অপেক্ষা
হিজরতের পর মুসলমানরা ষোলো-সতেরো মাস বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়েছেন। নবী ﷺ-এর মন চাইত কিবলা হোক ইবরাহীম (আ.)-এর কাবা; তিনি বারবার আকাশের দিকে তাকাতেন — যেন ওহির অপেক্ষা।
অবশেষে নাজিল হলো: “আমি আপনাকে বারবার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি; তাই আপনাকে সেই কিবলার দিকেই ফেরাব যা আপনি পছন্দ করেন — এখন মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরান” (সূরা বাকারা ১৪৪)।
২ রুকুতে থাকা মুসল্লিরা ঘুরে গেলেন
কাবার দিকে প্রথম পূর্ণ নামাজ ছিল আসর। বারা (রা.) বলেন, নবী ﷺ-এর সাথে যিনি নামাজ পড়েছিলেন তাঁদের একজন বেরিয়ে এক মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন — সেখানকার মুসল্লিরা তখন রুকুতে। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম, আমি নবী ﷺ-এর সাথে মক্কার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ে এসেছি। তাঁরা রুকু অবস্থাতেই কাবার দিকে ঘুরে গেলেন (সহিহ বুখারি ৪০)।
প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী সেই মসজিদটি বনু সালিমার এই মসজিদ — এক নামাজে দুই কিবলা, তাই নাম কিবলাতাইন। একই রকম ঘটনা পরদিন ফজরে কুবায়ও ঘটে।
যাঁরা কিবলা পরিবর্তনের আগে মারা গিয়েছিলেন, তাঁদের নামাজের কী হবে — এ প্রশ্নের জবাবে আয়াত এল: “আল্লাহ তোমাদের ঈমান (নামাজ) নষ্ট করবেন না” (সূরা বাকারা ১৪৩)।
📖 কুরআনে এই জায়গা
قَدْ نَرَىٰ تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ ۖ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَاهَا ۚ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ
নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন।
— সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৪৪ (অংশ)
وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنْتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ يَتَّبِعُ الرَّسُولَ مِمَّنْ يَنْقَلِبُ عَلَىٰ عَقِبَيْهِ ۚ وَإِنْ كَانَتْ لَكَبِيرَةً إِلَّا عَلَى الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ ۗ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ
আপনি যে কেবলার উপর ছিলেন, তাকে আমি এজন্যই কেবলা করেছিলাম, যাতে একথা প্রতীয়মান হয় যে, কে রসূলের অনুসারী থাকে আর কে পিঠটান দেয়। নিশ্চিতই এটা কঠোরতর বিষয়, কিন্তু তাদের জন্যে নয়, যাদেরকে আল্লাহ পথপ্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ এমন নন যে, তোমাদের ঈমান নষ্ট করে দেবেন।
— সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৪৩ (অংশ)
📜 পূর্ণ হাদিস
হাদিসগুলো সম্পূর্ণ দেওয়া হয়েছে — কোনো অংশ বাদ দেওয়া হয়নি। প্রতিটির নিচে আরবি মূল পাঠও আছে।
হাদিস ১ · সহিহ বুখারি, হাদিস ৪০
রুকু অবস্থায় কিবলা পরিবর্তন
মূল কথা: কাবার দিকে প্রথম নামাজ আসর; এক মসজিদের মুসল্লিরা রুকুতেই ঘুরে গেলেন।
বারাআ (ইবনু ‘আযিব) (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করে সর্বপ্রথম আনসারদের মধ্যে তাঁর নানাদের গোত্র [আবূ ইসহাক (রহ.) বলেন] বা মামাদের গোত্রে এসে ওঠেন। তিনি ষোল-সতের মাস বাইতুল মাকদিসের দিকে ফিরে সালাত আদায় করেন। কিন্তু তাঁর পছন্দ ছিল যে, তাঁর কিবলা বাইতুল্লাহর দিকে হোক। আর তিনি (বাইতুল্লাহর দিকে) প্রথম যে সালাত আদায় করেন, তা ছিল আসরের সালাত এবং তাঁর সঙ্গে একদল লোক সে সালাত আদায় করেন। তাঁর সঙ্গে যাঁরা সালাত আদায় করেছিলেন তাঁদের একজন লোক বের হয়ে এক মসজিদে মুসল্লীদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তাঁরা তখন রুকূ‘ অবস্থায় ছিলেন। তখন তিনি বললেনঃ ‘‘আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, এইমাত্র আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে মক্কার দিকে ফিরে সালাত আদায় করে এসেছি। তখন তাঁরা যে অবস্থায় ছিলেন সে অবস্থায়ই বাইতুল্লাহর দিকে ঘুরে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বায়তুল মাকদিস-এর দিকে সালাত আদায় করতেন তখন ইয়াহুদীদের ও আহলি-কিতাবদের নিকট এটা খুব ভাল লাগত; কিন্তু তিনি যখন বায়তুল্লাহর দিকে তাঁর মুখ ফিরালেন তখন তারা এটা খুব অপছন্দ করল। যুহায়র (রহ.) বলেন, আবূ ইসহাক (রহ.) বারাআ (রাযি.) থেকে আমার নিকট যে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাতে এ কথাও রয়েছে যে, কিবলা পরিবর্তনের পূর্বে বেশ কিছু লোক মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং শাহাদাত বরণ করেছিলেন, তাঁদের ব্যাপারে আমরা কী বলব, সেটা আমাদের জানা ছিল না। তখন আল্লাহ তা‘আলা অবতীর্ণ করেনঃ (وَمَا كَانَ اللهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ) ‘‘আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাদের সালাতকে বিনষ্ট করবেন না’’।
আরবি মূল পাঠ দেখুন ▼আরবি মূল পাঠ লুকান ▲
حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ خَالِدٍ، قَالَ حَدَّثَنَا زُهَيْرٌ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو إِسْحَاقَ، عَنِ الْبَرَاءِ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ أَوَّلَ مَا قَدِمَ الْمَدِينَةَ نَزَلَ عَلَى أَجْدَادِهِ ـ أَوْ قَالَ أَخْوَالِهِ ـ مِنَ الأَنْصَارِ، وَأَنَّهُ صَلَّى قِبَلَ بَيْتِ الْمَقْدِسِ سِتَّةَ عَشَرَ شَهْرًا، أَوْ سَبْعَةَ عَشَرَ شَهْرًا، وَكَانَ يُعْجِبُهُ أَنْ تَكُونَ قِبْلَتُهُ قِبَلَ الْبَيْتِ، وَأَنَّهُ صَلَّى أَوَّلَ صَلاَةٍ صَلاَّهَا صَلاَةَ الْعَصْرِ، وَصَلَّى مَعَهُ قَوْمٌ، فَخَرَجَ رَجُلٌ مِمَّنْ صَلَّى مَعَهُ، فَمَرَّ عَلَى أَهْلِ مَسْجِدٍ، وَهُمْ رَاكِعُونَ فَقَالَ أَشْهَدُ بِاللَّهِ لَقَدْ صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قِبَلَ مَكَّةَ، فَدَارُوا كَمَا هُمْ قِبَلَ الْبَيْتِ، وَكَانَتِ الْيَهُودُ قَدْ أَعْجَبَهُمْ إِذْ كَانَ يُصَلِّي قِبَلَ بَيْتِ الْمَقْدِسِ، وَأَهْلُ الْكِتَابِ، فَلَمَّا وَلَّى وَجْهَهُ قِبَلَ الْبَيْتِ أَنْكَرُوا ذَلِكَ. قَالَ زُهَيْرٌ حَدَّثَنَا أَبُو إِسْحَاقَ عَنِ الْبَرَاءِ فِي حَدِيثِهِ هَذَا أَنَّهُ مَاتَ عَلَى الْقِبْلَةِ قَبْلَ أَنْ تُحَوَّلَ رِجَالٌ وَقُتِلُوا، فَلَمْ نَدْرِ مَا نَقُولُ فِيهِمْ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى {وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ}
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৪০
হাদিস ২ · সহিহ বুখারি, হাদিস ৪০৩
কুবায় ফজরের নামাজে কিবলা পরিবর্তন
মূল কথা: পরদিন কুবার মুসল্লিরাও নামাজের মধ্যে ঘুরে গেলেন।
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা লোকেরা কুবা নামক স্থানে ফজরের সালাত আদায় করছিলেন। এমন সময় তাদের নিকট এক ব্যক্তি এসে বললেন যে, এ রাতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে। আর তাঁকে কা‘বামুখী হবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কাজেই তোমারা কা‘বার দিকে মুখ কর। তখন তাঁদের চেহারা ছিল শামের (বায়তুল মুকাদ্দাসের) দিকে। একথা শুনে তাঁরা কা‘বার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
আরবি মূল পাঠ দেখুন ▼আরবি মূল পাঠ লুকান ▲
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكُ بْنُ أَنَسٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، قَالَ بَيْنَا النَّاسُ بِقُبَاءٍ فِي صَلاَةِ الصُّبْحِ إِذْ جَاءَهُمْ آتٍ فَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَدْ أُنْزِلَ عَلَيْهِ اللَّيْلَةَ قُرْآنٌ، وَقَدْ أُمِرَ أَنْ يَسْتَقْبِلَ الْكَعْبَةَ فَاسْتَقْبِلُوهَا، وَكَانَتْ وُجُوهُهُمْ إِلَى الشَّأْمِ، فَاسْتَدَارُوا إِلَى الْكَعْبَةِ.
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৪০৩
✅ জিয়ারতের আদব ও টিপস
- •আগে মসজিদের ভেতরে পুরোনো (বাইতুল মুকাদ্দাসমুখী) মিহরাবের চিহ্ন ছিল; এখন শুধু কাবামুখী মিহরাব। দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়তে পারেন।
- •এখানে নামাজের আলাদা কোনো ফজিলত বর্ণিত নেই — এটি ইতিহাস জানার জায়গা।
হাদিসের বাংলা অনুবাদ প্রচলিত বাংলা অনুবাদ থেকে নেওয়া, আরবি মূল পাঠসহ; হাদিস নম্বর আন্তর্জাতিক প্রচলিত নম্বর অনুযায়ী। ঐতিহাসিক বিবরণ সহিহ হাদিস ও সীরাত গ্রন্থ অনুসারে — যেখানে বর্ণনা দুর্বল বা মতভেদপূর্ণ, সেখানে তা উল্লেখ করা হয়েছে।